নবীন আরপ্রবীণের মিলনে ডোভার লেন সঙ্গীত উৎসব

এই শহরে প্রতি বছর শীতের উষ্ণতা ছড়িয়ে যায় মার্গ সঙ্গীতের আসরে। .যে কয়েকটি আসর এখনও ধারাবাহিকভাবে পথ চলেছে তার মধ্যে অন্যতম ডোভার লেন সঙ্গীত সম্মেলন। চারদিনের  সেই সঙ্গীত সম্মেলনের কথা …

ডোভার লেনের মিউজিক কনফারেন্সের ৭৩তম বার্ষিক সঙ্গীত সম্মেলনে(২২/২৩/২৪/২৫জানুয়ারি) এবছর সঙ্গীত সম্মানপুরষ্কারে সম্মানিত হলেন ধ্রুপদী মণিপুরী নৃত্যশিল্পী এলম ইন্দিরা দেবী। প্রারম্ভে উদ্বোধনী সঙ্গীত বন্দেমাতরমপরিবেশন করেন ডোভার লেন কমিটি আয়োজিত প্রতিযোগিতায় সর্ব বিভাগে প্রথম স্থানাধিকারী মৈত্রেয়ী রায়। এদিন মূল অনুষ্ঠানের শুরু এলম ইন্দিরা দেবী ও তাঁর শিষ্যদের মেইতেইনৃত্য প্রদর্শনে। মূলতঃ মণিপুরী লাই হারাওবারাসঘরানার জন্যই বিশেষভাবে পরিচিত এলম ইন্দিরার  একক পরিবেশন কৃষ্ণ প্রণয়ম’, ‘রাধা নাট্যম’, ‘বাডিং অফ ফ্লাওয়ারএরপর তিনি ও তাঁর সহশিল্পীদের সমবেত  পরিবেশনে ছিল রাধা কৃষ্ণের চারটি উপাখ্যান। আমন আলি বাঙ্গাশ (সরোদ) ও তন্ময় বোসের অনুষ্ঠানটি শ্রোতাদর কাছে ছিল আনন্দদায়ক। আমনের প্রথম পরিবেশন অধুনা প্রায় অশ্রুত শুদ্ধ গৌরীতে মাধুর্যময় আওচার এবং এরপর ললিতা গৌরীতে আড়া চৌতাল, ঝাঁপতাল ও ত্রিতাল বন্দীশ। শুদ্ধ গৌরীতে স্বরবিন্যাসের সৌন্দর্যললিতা গৌরীর আড়া চৌতাল বন্দীশে বৈচিত্র্যময় তান, ঝাঁপতাল বন্দীশে ছন্দবৈচিত্র্যের অতি দ্রুত তান ও ঝালার নৈপুণ্য লক্ষণীয়। পরবর্তী  একতালে একত্রে তিনটি বন্দীশ, ললিতাধ্বনি, হংসধ্বনি ও সরস্বতী পরিবেশনে  একেকটি রাগে  প্রবেশ অতি মসৃণভাবে। শেষ পরিবেশন নন্দকোষে বিলম্বিত ত্রিতালসহযোগী তবলা শিল্পী তন্ময় বোসের  সৌন্দর্যময় বাদনকৌশল ও শঙ্কর নারায়ণ স্বামীর মৃদঙ্গমে অনুষ্ঠানটি ছিল প্রাণবন্ত। উল্‌হাস কাশলকরের পরিবেশন আনে শুদ্ধতার সঙ্গে গায়নশৈলীর অসাধারণত্ব। প্রথম নিবেদন যোগকৌস্‌ (বিলম্বিত মধ্যলয় ত্রিতাল, দ্রুত একতাল) বহল্‌ওয়াযুক্ত বিস্তারে অপূর্ব বড়হত, বোলবাট, বোলতানে ছিল রূপময়। পরবর্তী কাফী-কানাড়ার ত্রিতাল বিলম্বিত মুগ্ধকর বোল-বাটের অনন্যতা ও দ্রুত ত্রিতালে অনন্যসাধারণ তানকারীতে। স্বরক্ষেপণের সৌন্দর্যে অতুলনীয় পরিবেশন মালতী-বসন্ত (দ্রুত ত্রিতাল) ও দেশ রাগে বন্দীশ (আধ্বা) ও তারানা। ডঃ এস বল্লেশ ভজন্ত্রী সানাই পরিবেশন করলেন মারু বেহাগে (বিলম্বিত মধ্যলয় ও দ্রুত ত্রিতাল।  বর্তমান প্রজন্মের কণ্ঠশিল্পী রংকিনী গুপ্তা গোয়ালিয়র ও কিরানা শৈলীতে নিজের কমপোজিশনে শোনালেন নটভৈরব (বিলম্বিত একতাল, আধ্বা, তরানা, দ্রুত ত্রিতাল) এবং শেষে মিঞা কি টোড়ী। শেষ শিল্পী কুমার গন্ধর্ব কন্যা কলাপিনি কোমকলির পরিবেশন কিরানা শৈলীতে ভৈরবের এক বিশেষ প্রকার, শিব-ভাটিয়ার (অপ্রচলিত), ভাটিয়ার ও একটি ভজন। 

প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে উলহাস কাশলকর

আশীষ খানের স্মরণে দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠান শুরু এ প্রজন্মের নৃত্যপ্রতিভা বৈদেহী কুলকার্নির চমৎকার কুচিপুড়ি নৃত্যগণপতি ভজন শিবাষ্টকম (মোহনম/খণ্ডচাপু), কীর্তন, ‘গোবর্ধন গিরি তরঙ্গম’, থালার ওপর নৃত্য মনোরম হয়ে ওঠে অভিব্যক্তি, সুচারু মুদ্রাভঙ্গির কমনীয়তা, পদচারণা ইত্যাদিতে। উজ্জ্বল ভারতীয়  তবলাবাদনের সুসহযোগিতায় বেহালা শিল্পী সঞ্জয় ঘোষের জয়জয়ন্তী (তিতাল মধ্যলয় ও দ্রুত) ছড়ের সুনিয়ন্ত্রিত টানে, বাদনকৌশলে, শব্দক্ষেপণের ও উৎপাদনের বিশেষ পারদর্শিতাতানকারীর উৎকর্ষতায় ছিল লালিত্যময় ও  মনোগ্রাহী। ধুন বাজিয়ে শেষ হয় তাঁর অনুষ্ঠান। সঞ্জয় অধিকারী ও প্রদীপ পালিতের যথার্থ সহযোগিতায় সোহিনী রায় চৌধুরীর পরিবেশন যোগ – একতাল বিলম্বিত, দ্রুত ত্রিতাল, তরানা ও শেষে মিশ্র খাম্বাজ ঠুম্‌রি। শুভজ্যোতি গুহর সমঝোতাপূর্ণ ও চমৎকার সহযোগিতায় বংশীবাদকদ্বয়, পিতা-পুত্র প্রবীণ ও শাদাজ গোরখিণ্ডি  শোনালেন চন্দ্রকোষ (আলাপ-জোড়-রূপক ও ত্রিতাল বন্দীশ, কানাড়া (দ্রুত একতাল) ও রাগমালিকা। নিজের সৃষ্ট মন্দ্রবংশী ব্যবহার করলেন তিনি যেখানে মন্দ্রসপ্তকেরও নীচে সর্বনিম্ন পঞ্চম লাগানো যায়। পিতা-পুত্রের শব্দক্ষেপণ, নিয়ন্ত্রণ মীড়মোচড় ও বোলবাণীতে ছিল চন্দ্রকোষের সৌন্দর্যময় রূপ ও কানাড়ার কারুণ্য। বেনারস ঘরানার সাজন মিশ্রর মনোগ্রাহী আবেদনপূর্ণ সঙ্গীত নিবেদনের মাধুর্যে বর্ণময় হয়ে ওঠে সালগ বরালী টোড়ী বিলম্বিত একতাল, ত্রিতাল, তরানা এবং শেষে ছিল রাগ গুণকেলীর চমৎকার দ্রুত বন্দীশ  সেতার শিল্পী অনুপমা ভাগবতের বসন্তমুখারি, ভাটিয়ার ও ভৈরবী ঋদ্ধ লালিত্যময় গায়কী অঙ্গের বোলবাণীতে। 

দ্বিতীয় দিনে বেনারস ঘরানার সাজন মিশ্র

উস্তাদ জাকির হুসেনকে নিবেদিত তৃতীয় দিনের অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে ছিল গীতা শিরীষার ভরতনাট্যম দেবীকৃতি কামাক্ষী (মিশ্র চাপু), বর্ণম (ঋতিগৌড়া/আদিতাল), জয়দেবের অষ্টপদী (সিন্ধু ভৈরবী), তিল্লানা। সন্দীপন সমাজপতির আত্মবিশ্বাসপূর্ণ পরিবেশন কৌশিকী-কানাড়া (বিলম্বিত একতাল, মধ্যলয় ও দ্রুত তিতাল) ও যথার্থ ঠহ্‌রানে ঠুম্‌রি। মোহনবীণায় বিশ্বমোহন ভাট তাঁর নিজস্ব বাদনকৌশলে, পরিশীলিত পরিবেশনে শোনালেন মারুবেহাগ (আলাপ), ত্রিতাল বিলম্বিত ও দ্রুত ও তবলা শিল্পী শুভেন চ্যাটার্জির চমৎকার বাদনশৈলীর সঙ্গে ছিল সওয়াল জবাবএরপর বসন্ত রাগে বন্দীশ ও কেসরিয়া বালমবাজালেন স্বকণ্ঠে গেয়ে। সুন্দর কণ্ঠসম্পদের সুচারু, নিপুণ পরিবেশনে শ্রোতাদের মুগ্ধ করলেন পদ্মিনী রাও। তাঁর চয়নে ছিল নিজের কমপোজিশনে আভোগী (দ্রুত একতাল, ত্রিতাল, তরানা), মধুরকৌঁস (রূপক, দ্রুত একতাল, তরানা) এবং মনোগ্রাহী গায়নশৈলীতে মীরার ভজন। সন্তুর শিল্পী তরুণ ভট্টাচার্যর পরিচ্ছন্ন পরিবেশন বসন্তমুখারি। বর্তমানে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত জগতে সুপরিচিত স্যাক্সোফোনবাদক ফিল স্ক্রাফ  সানাইবাদক বিকাশ বাবুর সহযোগিতায় পরিবেশন করলেন আহিরভৈরব, কাজরী, ভৈরবী, ভাটিয়ার যেগুলিতে ছিল এক ধরণের স্বতন্ত্রতা। 

তৃতীয় দিনের শিল্পী গীতা শিরীসার ভরতনাট্যম
তৃতীয় দিনের শিল্পী গীতা শিরীসার ভরতনাট্যম

সরোদবাদক রাজীর তারানাথকে উৎসর্গীকৃত শেষ দিনের অনুষ্ঠানের প্রথমে কথকনৃত্য পরিবেশনে ছিলেন সুদীপ চক্রবর্তী। দক্ষিণী শিল্পী জয়ন্তী কুমারেশ ত্যাগরাজের কম্‌পোজিশনে সরস্বতী বীণাবাদনে শোনালেন কিছু দক্ষিণী রাগ। ব্রিজভূষণ গোস্বামীর গাম্ভীর্যময় উদাত্ত কণ্ঠে চন্দ্রকোষে ধ্রুপদ পরিবেশনের উৎকর্ষতা এক অন্য আবহ সৃষ্টি করে। এ প্রজন্মের প্রতিভা মেওয়াতি ঘরানার অঙ্কিতা যোশীর সুকণ্ঠে যথার্থ পরিবেশন আহির ভৈরব, কিরওয়ানি ও হাবেলি সঙ্গীতপরবর্তী পাখাওয়াজ ও ডিভাইন ড্রামস্‌ গ্রুপের শিল্পীরা ছিলেন শুভাশিস্‌ সব্যসাচী (ঘোষ) এবং শৌনক ব্যানার্জী। অনুষ্ঠানটির চিন্তা-ভাবনা একটু অন্য ধরণের ও পরীক্ষামূলক। সম্মেলন শেষ হয় সুজাত খান (সেতার) ও কিশোর প্রতিভা অনির্বাণ রায়ের (বাঁশী) দ্বৈত বাদনে। প্রথমে আলাহিয়া বিলাবল ও পরে  শোনা গেল ছোট ছোট কম্পোজিশনে কয়েকটি ধুন। সমগ্র অনুষ্ঠানে অন্যান্য সহযোগী যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পীরা ছিলেন  যথার্থ। 

দক্ষিনী শিল্পী জয়ন্তী কুমারেশের সরস্বতী বীনাবাদন